নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বালাতৈড় সিদ্দিক হোসেন ডিগ্রি কলেজে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, নথি জালিয়াতি ও স্বাক্ষর জালের যে অভিযোগ কয়েক বছর ধরে আলোচিত হয়ে আসছে, তা ফের সামনে এসেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রকাশের পর। সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্তসংক্রান্ত তথ্য ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অসঙ্গতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বালাতৈড় সিদ্দিক হোসেন ডিগ্রি কলেজে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, নথি জালিয়াতি ও স্বাক্ষর জালের যে অভিযোগ কয়েক বছর ধরে আলোচিত হয়ে আসছে, তা ফের সামনে এসেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রকাশের পর। সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্তসংক্রান্ত তথ্য ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অসঙ্গতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।কলেজটির অধ্যক্ষ ড. মো. আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে নিয়োগ বোর্ডের প্রতিনিধিদের স্বাক্ষর জাল, রেজুলেশন পরিবর্তন এবং বৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকের নথি পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রকাশিত তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কমিটির একজন কর্মকর্তা অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
একই নিয়োগে তিনজন থেকে আটজন—কোথায় গেল নিয়োগের নিয়ম?
তদন্তসংক্রান্ত নথি ও পূর্বে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৮ জুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের পর কলেজটির শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড গঠন করা হয়। ওই বছরের ৩১ আগস্ট গার্হস্থ্য অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিভাগে তিনজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।তাঁরা হলেন—গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের ফারহানা আফরোজ, মনোবিজ্ঞান বিভাগের মো. শহিদুজ্জামান এবং অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মো. এরশাদ আলী।কিন্তু পরবর্তীতে একই সময়ের নিয়োগসংক্রান্ত নথিতে আরও পাঁচজন শিক্ষককে নিয়োগ দেখানোর অভিযোগ ওঠে। তাঁদের মধ্যে দর্শন বিভাগে কামাল হোসেন, বাংলা বিভাগে মানিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে জাকির হোসেন, ইংরেজি বিভাগে রাজীব এবং ভূগোল বিভাগে আবু রায়হানের নাম রয়েছে।অর্থাৎ, একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেখানে তিনজনের নিয়োগের তথ্য ছিল, সেখানে পরবর্তী নথিতে আটজনের নিয়োগ দেখানোর অভিযোগ ওঠে। এ জায়গাতেই প্রশ্ন উঠেছে—কোন নথি আসল, কোনটি পরে তৈরি বা পরিবর্তিত এবং কীভাবে অতিরিক্ত পাঁচজনের নিয়োগ দেখানো হলো?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের স্বাক্ষর জালের অভিযোগ
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হলো—২০১৫ সালের নিয়োগ বোর্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রতিনিধির স্বাক্ষর জাল করে নথি তৈরির অভিযোগ।প্রাপ্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি থেকে দেখা যায়, ২০১৫ সালে বালাতৈড় সিদ্দিক হোসেন ডিগ্রি কলেজের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সরকারি কলেজের বিভাগীয় প্রধানদের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল।চিঠিতে বাংলা, ইংরেজি, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ভূগোল, অর্থনীতি ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি—বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।এ অবস্থায় নিয়োগ বোর্ডের প্রতিনিধিদের স্বাক্ষরসংবলিত নথি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রেজুলেশনে কাটাকাটি-ঘষামাজা, আটজনের নিয়োগ দেখিয়ে বেতন আবেদনের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২২ আগস্টের মূল রেজুলেশনে কাটাকাটি ও ঘষামাজার বিষয়টি ধরা পড়ে। এ নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অঞ্চল, রাজশাহী কার্যালয় সন্দেহ প্রকাশ করে এবং এরশাদ আলী ও দর্শন বিভাগের শিক্ষক কামাল হোসেনের বেতন আবেদন বাতিল করে।এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, পাঁচজনের নিয়োগ বৈধ দেখানোর জন্য বৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া প্রভাষক এরশাদ আলীর নিয়োগ-সংক্রান্ত চিঠিপত্র ও রেজুলেশনে পরিবর্তন আনা হয়।নিয়োগ বোর্ডের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধির চিঠি, ডিজি প্রতিনিধির নিয়োগসংক্রান্ত চিঠি, সাক্ষাৎকার বোর্ডের ফলাফল শিট, রেজুলেশনসহ বিভিন্ন নথি পরিবর্তন বা জাল করে আটটি বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেখিয়ে বেতন আবেদন প্রস্তুতের অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়েই মাউশির তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে।
কৈফিয়ত তলবের পরও জবাব না দেওয়ার অভিযোগ
রেজুলেশনে অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর কলেজ অধ্যক্ষের কাছে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ সময় পার হলেও অধ্যক্ষ এ বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব দেননি।পরবর্তীতে শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা কলেজে গিয়ে নথিপত্র যাচাই-বাছাই করেন। প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, তাঁরা সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন।
মাউশির তদন্তে সত্যতা, কিন্তু ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
২০২২ সালে প্রকাশিত তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মাউশির দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল। পরবর্তীতে তদন্ত প্রতিবেদন মাউশিতে পাঠানো হলেও দীর্ঘ সময় ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।অভিযুক্ত অধ্যক্ষ মো. আমজাদ হোসেন অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রেজুলেশনে কাটাকাটি ভুলবশত হয়েছে এবং জালিয়াতি করা হয়নি। তিনি অভিযোগকে তাঁকে হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা বলেও দাবি করেছিলেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে নতুন মোড়
এদিকে এখন পাওয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি ঘটনাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। চিঠিতে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মো. এরশাদ আলীর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিধান এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এরশাদ আলীকে স্বপদে পুনর্বহাল করতে হবে এবং বিষয়টি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে অবহিত করতে হবে।অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগসংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে থাকা ওই শিক্ষকের বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তাঁর পক্ষে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রশ্ন এখন একটাই—জাল নথি তৈরি করে থাকলে দায় কার?
পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নিয়োগ বোর্ডে তিনজনের নিয়োগের পর কীভাবে আরও পাঁচজনের নাম যুক্ত হলো? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ও ডিজি প্রতিনিধির স্বাক্ষরসংবলিত নথিতে অসঙ্গতি কীভাবে তৈরি হলো? রেজুলেশনে কাটাকাটি-ঘষামাজা কেন করা হলো? আর এসব নথির ভিত্তিতে বেতন আবেদন তৈরির চেষ্টা হয়ে থাকলে এর দায় কার? একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় এমন অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় নয়; এর সঙ্গে শিক্ষার মান, শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং সরকারি অর্থে বেতন-ভাতা প্রদানের বৈধতা সরাসরি জড়িত।কলেজটির বর্তমান ওয়েবসাইটেও ড. মো. আমজাদ হোসেনকে অধ্যক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কে নথি পরিবর্তন করেছে, কার স্বাক্ষর জাল হয়েছে, অতিরিক্ত নিয়োগ দেখানোর পেছনে কার ভূমিকা ছিল এবং এর ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।